
মোঃ আসাদ আলী,বোচাগঞ্জ(দিনাজপুর)প্রতিনিধিঃ
সীমান্তে রাণীরঘাটে
রাস্তার দুই পাশে অনেকগুলো খাবারের হোটেল। একটি হোটেলের ভেতরে ঢুকতেই নজর কাড়ল দেয়ালে আঁকা বিভিন্ন ফুলের নকশা। এরই পাশে লেখা, ‘ভাবির হোটেল–১’।
এখানে প্রায় নারীর ৭/৮ টি হোটেল। সব কটির নামই ভাবির হোটেল।
হোটেল সবগুলোর টেবিলেই রাখা থাকে গামলা ভরা হাঁসের মাংস। নিরিবিলি পরিবেশ, ভোজনরসিকেরা আসছেন, পেটপুজো করছেন, চলে যাচ্ছেন। খাবার পরিবেশন থেকে বিল নেওয়া—সব কাজই করছেন ‘ভাবি’।
ভাবীদের হোটেল সস্তা ও সুস্বাদু হাঁসের ভুনা মাংসের জন্য বিখ্যাত। হোটেলে নেই কোন পুরুষ কর্মচারী, খাবার পরিবেশন করা, ক্যাশে টাকা নেওয়াসহ সব কাজ করেন নারী শ্রমিকরা। হোটেল ব্যবসা করে ভাবীরা হয়ে উঠেছেন স্বাবলম্বী।
দিনাজপুর শহর থেকে ৩৪ কিলোমিটার দূরে ভারত সীমান্ত ঘেঁষে বয়ে চলেছে টাঙ্গন নদ। নদের ওপরে নির্মিত হয়েছে সেতুসহ রাবার ড্যাম। দিনাজপুরের বোচাগঞ্জ উপজেলার এই জায়গার নাম রানীর ঘাট মোড়। তবে এখন ভাবির হোটেল, ভাবির মোড় নামেই পরিচিতি ’।
কেন এই নাম?
স্থানীয় বাসিন্দা মাহাবুর রহমান জানালেন, খাবার হোটেলগুলো পরিচালনা করেন এলাকার কয়জনের স্ত্রী। তাঁদের ভাবি বলে ডাকেন সবাই। তাই হোটেলের নামও হয়েছে ভাবীর হোটেল। দিনে দিনে তাঁদের হোটেলে হাঁসের মাংসের রান্নার স্বাদ মুখে মুখে চারদিকে ছড়িয়ে পড়ায় এখন রানীর ঘাট পরমেশ্বরপুর নাম বদলে ‘ভাবির মোড়’ হিসেবে পরিচিতি লাভ করেছে।
জানা যায়, এই স্থানটির নাম ছিলো রাণীরঘাট। প্রায় ২৫ বছর আগে এই রানীরঘাটে শুকনা মৌসুমে উত্তোলন হতো বালু। প্রতিদিন এই ঘাটে ৬০ থেকে ৭০টি ট্রাক্টর দিয়ে শ্রমিকরা বালু উত্তোলনের কাজ করতেন। তবে রাণীরঘাটে ছিলো না তখন কোন চা-নাস্তার দোকান। জীবিকার তাগিদে তখন প্রথম জামাল উদ্দিনের স্ত্রী মাসতারা বেগম একটি চায়ের দোকান দেন। ঘাটের রাস্তাটি ছিলো কাঁচা। পরবর্তীতে শুরু হয় রাস্তাটি পাকাকরণের কাজ। রাস্তার শ্রমিকদের জন্য তার ছোটো হোটেলে শুরু হয় ভাত বেচাবিক্রি। শ্রমিকদের অনুরোধে প্রথমে রান্না করেন একটি হাঁসের মাংস। তার হাতের রান্না খেয়ে মুগ্ধ তারা। এর পর থেকে শুরু হাঁসের মাংস রান্না। অল্প দিনের মধ্যে চারপাশে ছড়িয়ে পড়ে মাসতারা বেগমের হাতের সুস্বাদু হাঁসের মাংস রান্নার খবর। পরে তাকে দেখে এলাকার আরও তিন ভাবী হাঁসের মাংসের হোটেল দেন। প্রথম থেকেই এই চার মহিলাকে সবাই ভাবী বলে সম্বোধন করতো । মূলত তখন থেকে হোটেলগুলোর নাম হয় ভাবীর হোটেল। আস্তে আস্তে রাণীরঘাট নামটি পরিবর্তন হয়ে ভাবীর মোড় হিসেবে পরিচিতি লাভ করে এলাকার মানুষের কাছে। দিনাজপুর জেলাসহ আশপাশের সব জেলার মানুষ এই ভাবির মোড়কে চিনে এবং জানে। প্রতিদিন দূর-দূরান্ত থেকে ছুটে আসছেন ভাবির মোড়ের ভাবীদের হোটেলে হাঁসের মাংস দিয়ে খাবার খেতে।
মোড়ের কয়েকটি হোটেল পরিচালনা করছেন জামালউদ্দিনের স্ত্রী মাসতারা বেগম (৪৫), দেলোয়ার হোসেনের স্ত্রী তাসলিমা আক্তার (৪০), নাজমুল হকের স্ত্রী মেরিনা পারভীন (৩৭) এবং হুসেন আলীর স্ত্রী বেলী আক্তার (৪০)। এছাড়াও রয়েছে আরও অনেকগুলো ভাবির হোটেল
হোটেলগুলোতে ২০০ থেকে ৩০০ টাকার খাবারের প্যাকেজ। যে যেমন ইচ্ছা ভাত, হাঁসের মাংস ও বিভিন্ন প্রকার নানান রকমের ভর্তা খেতে পারেন। ভাবিদের হোটেলে প্রতিদিন জবাই হয় ৫০ থেকে ৬০টি হাঁস। বেচাবিক্রি হয় দিনে ২০ থেকে ২৫ হাজার টাকা। তবে সরকারি ছুটির দিনে বেচাবিক্রি আরও বেশি হয়। শহর থেকে একেবারে অজপাড়াগাঁ ভারত সীমান্তে ঘেঁষে এই ভাবীর মোড়।
দেখা যায়, হোটেলগুলোতে বসার জায়গা না পেয়ে অনেকেই খাবারের অপেক্ষায় দাঁড়িয়ে থাকেন। দেখে মনে হবে যেন কোনো বিয়ে বাড়ির দাওয়াতে এসেছেন তারা। কেউ কেউ খাবারের সময় মোবাইল ফোনে ছবি তুলছে। বিভিন্ন গণমাধ্যমের সাংবাদিকরা নিউজ করতে এসে নিজেরাও এই হোটেলে খাবার খেয়ে যায়।
একদিকে মুখরোচক খাবার, অন্যদিকে টাঙ্গন নদের ওপরে রাবার ড্যামের সৌন্দর্য। দুটি কারণেই অনেক বছর ধরে এখানে দর্শনার্থীদের ভিড় বাড়ছে।
ভাবির হোটেলের গোড়াপত্তন……..?
১৯৯০ সালের কথা। শুষ্ক মৌসুমে টাঙ্গন নদ থেকে ট্রাকে করে বালু উত্তোলন করা হয়। ট্রাকে বালু ভরতেন শ্রমিকেরা। তাঁদের দরকার পড়ল কাজের ফাঁকে একটু চা-নাশতার। তখন মোড়ে প্লাস্টিকের ছাউনি দিয়ে চা-বিস্কুট বিক্রি শুরু করেন সবজি বিক্রেতা জামালউদ্দিনের স্ত্রী মাসতারা বেগম। একদিন শ্রমিকদের অনুরোধেই সেখানে ডাল-ভাত-ডিম বিক্রি শুরু করেন। দুই বছর হলো বালুর ঘাট বন্ধ। থেকে গেছে ভাবির হোটেল। এভাবে ধীরে ধীরে রানীর ঘাট নাম বদলে হয়েছে ভাবির মোড়।
এই মোড়ে প্রথম হোটেল চালু করেন মাসতারা বেগম। তাঁর ব্যবসার উন্নতি দেখে একে একে পরবর্তী সময়ে আরও তিনজন এখানে হাঁসের মাংস ও ভাত বিক্রি শুরু করেন। এরপরে এখানো এখন অনেকগুলো হাঁসের মাংস ও ভাত বিক্রি শুরু করছেন।
ভাবী মাসতারা বেগম বলেন, দীর্ঘদিন যাবৎ এই মোড়ে আমরা হোটেল ব্যবসা করে আসছি। আমরা সব সময় কাস্টমারের মনপুত ও রুচিসম্মত খাবার পরিবেশন করে থাকি। কাস্টমার আমাদের লক্ষ্মী। জীবনে আমরা এক সময় অনেক অভাবী এবং অসহায় ছিলাম। বর্তমান হোটেল ব্যবসা করে আমরা সবাই স্বয়ংসম্পূর্ণ।
তিনি বলেন, আমরা চার ভাবী মিলেমিশে ব্যবসা করছি। আমাদের মাঝে কোন দ্বন্দ্ব নেই, সবাই সবার মতো কর্ম করে খাচ্ছি।

















