০৯:২১ অপরাহ্ন, সোমবার, ০২ নভেম্বর ২০২৬, ১৮ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

১০ টাকার সরকারি টিকিট, প্রেসক্রিপশনে ৮ হাজার টাকার টেস্ট—ডাঃ রাকিবের চিকিৎসা নিয়ে তীব্র প্রশ্ন!

  • blank Reporter Name
  • Update Time : ০৭:৫৯:০৪ পূর্বাহ্ন, মঙ্গলবার, ১৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬
  • ৫৭ Time View
blank
blank

 

নিজস্ব প্রতিবেদকঃ

খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের বহির্বিভাগে মাত্র ১০ টাকার টিকিটে চিকিৎসা নিতে আসা রোগীদের প্রেসক্রিপশনে ওষুধের পরিবর্তে একের পর এক ব্যয়বহুল পরীক্ষা-নিরীক্ষা লিখে দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে ডি-কার্ডের মেডিকেল অফিসার ডা. মোঃ রাকিবুল হাসানের বিরুদ্ধে। রোগীদের অভিযোগ, কয়েক হাজার টাকা মূল্যের এসব পরীক্ষা সরকারি হাসপাতালে না করিয়ে নির্দিষ্ট বেসরকারি ডায়াগনস্টিক সেন্টার থেকে করানোর পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে।

ডুমুরিয়া উপজেলা থেকে চিকিৎসা নিতে আসা রোগী আশিকুর রহমানের অভিযোগ, দীর্ঘ সময় অপেক্ষার পর বহির্বিভাগের ১০৬ নম্বর কক্ষে ডা. রাকিবুল হাসানকে দেখান তিনি। কিন্তু কোনো ওষুধ না লিখে প্রায় ৫ থেকে ৬ হাজার টাকার পরীক্ষা দেওয়া হয়। তাঁর ভাষ্য, চিকিৎসকের কক্ষের সামনে থাকা একজন অ্যাটেন্ডেন্ট তাকে একটি নির্দিষ্ট বেসরকারি ডায়াগনস্টিক সেন্টারে গিয়ে পরীক্ষা করানোর পরামর্শ দেন।
আশিকুর রহমান বলেন, তিনি মাত্র সাড়ে ছয় হাজার টাকা বেতনে চাকরি করেন। এত টাকার পরীক্ষা করানো তাঁর পক্ষে সম্ভব নয়।

বটিয়াঘাটার বারোয়ারী এলাকার আব্দুল্লাহর অভিযোগও প্রায় একই। সরকারি হাসপাতালে কম খরচে চিকিৎসার আশায় দূর থেকে এলেও চিকিৎসকের কাছ থেকে ওষুধের পরিবর্তে প্রায় পাঁচ হাজার টাকার পরীক্ষা-নিরীক্ষার পরামর্শ পেয়েছেন বলে জানান তিনি। তাঁর দাবি, এসব পরীক্ষা একটি নির্দিষ্ট বেসরকারি ডায়াগনস্টিক সেন্টারে করাতে বলা হয়েছে।

জিরোপয়েন্ট এলাকার রোগী রোকেয়ার অভিযোগ, তাঁর প্রেসক্রিপশনেও কোনো ওষুধ লেখা হয়নি। দেওয়া হয়েছে প্রায় ৮ হাজার টাকার পরীক্ষা। তাঁর প্রশ্ন, স্বল্প আয়ের মানুষ সরকারি হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে এসে যদি হাজার হাজার টাকার পরীক্ষা করাতেই বাধ্য হন, তাহলে সরকারি হাসপাতালের ওপর তাদের ভরসার জায়গাটি কোথায়?

অভিযোগের বিষয়ে সরেজমিন অনুসন্ধানে ১০৬ নম্বর কক্ষ থেকে বের হওয়া একাধিক রোগীর হাতে থাকা প্রেসক্রিপশনে ওষুধের পরিবর্তে বিভিন্ন পরীক্ষা-নিরীক্ষার উল্লেখ দেখা যায় বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। এসব পরীক্ষার মধ্যে রয়েছে- সিবিসি অ্যান্ড পিবিএফ, ইউরিনারি পরীক্ষা, ইসিজি, ইকো ডপলার, ট্রোপোনিন-আই অ্যান্টিজেন, আল্ট্রাসনোগ্রাম ও সিরাম ক্রিয়েটিনিন। রোগীদের দাবি, সব পরীক্ষা একসঙ্গে করাতে বেসরকারি ডায়াগনস্টিক সেন্টারে কয়েক হাজার টাকা ব্যয় হচ্ছে।

প্রশ্ন উঠছে, দীর্ঘদিন ধরে যদি ডা. মোঃ রাকিবুল হাসানের বিরুদ্ধে এমন অভিযোগ থেকেই থাকে, তাহলে এতদিনে কেন কোনো কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি? অভিযোগের পর অভিযোগ উঠলেও তিনি কীভাবে একইভাবে রোগী দেখার সুযোগ পাচ্ছেন? তাঁর পেছনে কি কোনো প্রভাবশালী ‘খুঁটির জোর’ রয়েছে, যার কারণে বারবার অভিযোগ উঠলেও তিনি জবাবদিহির বাইরে থেকে যাচ্ছেন?

সবচেয়ে বড় ভোগান্তিতে পড়ছেন সাধারণ রোগীরা। সরকারি হাসপাতালে অল্প খরচে চিকিৎসার আশায় এসে যদি শেষ পর্যন্ত বাইরে গিয়ে কয়েক হাজার টাকা খরচ করে পরীক্ষা করাতে হয়, তাহলে স্বল্প আয়ের মানুষের জন্য সরকারি হাসপাতালের সেবার উদ্দেশ্যই বা কতটা পূরণ হচ্ছে? ১০ টাকার টিকিটে চিকিৎসা নিতে এসে যদি রোগীর হাতে ৫ থেকে ৮ হাজার টাকার পরীক্ষার তালিকা ধরিয়ে দেওয়া হয়, তাহলে সেই রোগী যাবে কোথায়?

এ বিষয়ে ডা. মোঃ রাকিবুল হাসানের বক্তব্য জানতে চাইলে তিনি বলেন, এ বিষয়ে সামনাসামনি কথা বলবেন; ফোনে কিছু বলবেন না।

খুলনা মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালের কার্ডিওলজি বিভাগের বিভাগীয় প্রধান এবং মেডিসিন ও হৃদরোগ বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ডা. মোস্তফা কামাল বলেন, ডা. রাকিব হাসান কোনো মেডিকেল অফিসার নন এবং হাসপাতালের কার্ডিওলজি বিভাগের সঙ্গেও তাঁর কোনো সম্পর্ক নেই। তাহলে তিনি কীভাবে নিয়মিত কার্ডিওলজি বিভাগের রোগী দেখছেন এটাই বড় প্রশ্ন। হাসপাতালের সঙ্গে দায়িত্বগত সম্পৃক্ততা না থাকলে তিনি কোন ক্ষমতাবলে রোগী দেখছেন, সেটিও খতিয়ে দেখা প্রয়োজন। তাঁর বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগগুলো অত্যন্ত গুরুতর। তাঁর কর্মকাণ্ডের কারণে সাধারণ মানুষ আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত ও নিঃস্ব হয়ে পড়ছে। এ ধরনের কর্মকাণ্ড কোনোভাবেই মেনে নেওয়া যায় না। অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্ত করে সত্যতা পাওয়া গেলে তাঁর বিরুদ্ধে কঠোর শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া উচিত।

তবে অভিযোগের বিষয়ে হাসপাতালের পরিচালক ডা. কাজী মোহাম্মদ আইনুল ইসলাম বলেন, বিষয়টি তাঁর জানা ছিল না। অভিযোগটি তদন্ত করে সত্যতা পাওয়া গেলে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

এখন প্রশ্ন উঠেছে- সরকারি হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে আসা রোগীদের প্রেসক্রিপশনে কেন ওষুধের বদলে একের পর এক ব্যয়বহুল পরীক্ষা দেওয়া হচ্ছে, এসব পরীক্ষা কোথায় করানোর পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে এবং এর পেছনে কোনো বাণিজ্যিক স্বার্থ রয়েছে কি না। অভিযোগের সত্যতা যাচাইয়ে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের কার্যকর তদন্ত এবং প্রেসক্রিপশন, রোগী-রেজিস্টার ও সংশ্লিষ্ট ডায়াগনস্টিক সেন্টারের সঙ্গে কোনো যোগসূত্র আছে কি না তা খতিয়ে দেখা জরুরি।

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

About Author Information
blank

blank

আহত পত্রিকা বিক্রেতা বুলবুলের পাশে তানোর প্রেসক্লাব

১০ টাকার সরকারি টিকিট, প্রেসক্রিপশনে ৮ হাজার টাকার টেস্ট—ডাঃ রাকিবের চিকিৎসা নিয়ে তীব্র প্রশ্ন!

Update Time : ০৭:৫৯:০৪ পূর্বাহ্ন, মঙ্গলবার, ১৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬
blank
blank

 

নিজস্ব প্রতিবেদকঃ

খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের বহির্বিভাগে মাত্র ১০ টাকার টিকিটে চিকিৎসা নিতে আসা রোগীদের প্রেসক্রিপশনে ওষুধের পরিবর্তে একের পর এক ব্যয়বহুল পরীক্ষা-নিরীক্ষা লিখে দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে ডি-কার্ডের মেডিকেল অফিসার ডা. মোঃ রাকিবুল হাসানের বিরুদ্ধে। রোগীদের অভিযোগ, কয়েক হাজার টাকা মূল্যের এসব পরীক্ষা সরকারি হাসপাতালে না করিয়ে নির্দিষ্ট বেসরকারি ডায়াগনস্টিক সেন্টার থেকে করানোর পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে।

ডুমুরিয়া উপজেলা থেকে চিকিৎসা নিতে আসা রোগী আশিকুর রহমানের অভিযোগ, দীর্ঘ সময় অপেক্ষার পর বহির্বিভাগের ১০৬ নম্বর কক্ষে ডা. রাকিবুল হাসানকে দেখান তিনি। কিন্তু কোনো ওষুধ না লিখে প্রায় ৫ থেকে ৬ হাজার টাকার পরীক্ষা দেওয়া হয়। তাঁর ভাষ্য, চিকিৎসকের কক্ষের সামনে থাকা একজন অ্যাটেন্ডেন্ট তাকে একটি নির্দিষ্ট বেসরকারি ডায়াগনস্টিক সেন্টারে গিয়ে পরীক্ষা করানোর পরামর্শ দেন।
আশিকুর রহমান বলেন, তিনি মাত্র সাড়ে ছয় হাজার টাকা বেতনে চাকরি করেন। এত টাকার পরীক্ষা করানো তাঁর পক্ষে সম্ভব নয়।

বটিয়াঘাটার বারোয়ারী এলাকার আব্দুল্লাহর অভিযোগও প্রায় একই। সরকারি হাসপাতালে কম খরচে চিকিৎসার আশায় দূর থেকে এলেও চিকিৎসকের কাছ থেকে ওষুধের পরিবর্তে প্রায় পাঁচ হাজার টাকার পরীক্ষা-নিরীক্ষার পরামর্শ পেয়েছেন বলে জানান তিনি। তাঁর দাবি, এসব পরীক্ষা একটি নির্দিষ্ট বেসরকারি ডায়াগনস্টিক সেন্টারে করাতে বলা হয়েছে।

জিরোপয়েন্ট এলাকার রোগী রোকেয়ার অভিযোগ, তাঁর প্রেসক্রিপশনেও কোনো ওষুধ লেখা হয়নি। দেওয়া হয়েছে প্রায় ৮ হাজার টাকার পরীক্ষা। তাঁর প্রশ্ন, স্বল্প আয়ের মানুষ সরকারি হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে এসে যদি হাজার হাজার টাকার পরীক্ষা করাতেই বাধ্য হন, তাহলে সরকারি হাসপাতালের ওপর তাদের ভরসার জায়গাটি কোথায়?

অভিযোগের বিষয়ে সরেজমিন অনুসন্ধানে ১০৬ নম্বর কক্ষ থেকে বের হওয়া একাধিক রোগীর হাতে থাকা প্রেসক্রিপশনে ওষুধের পরিবর্তে বিভিন্ন পরীক্ষা-নিরীক্ষার উল্লেখ দেখা যায় বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। এসব পরীক্ষার মধ্যে রয়েছে- সিবিসি অ্যান্ড পিবিএফ, ইউরিনারি পরীক্ষা, ইসিজি, ইকো ডপলার, ট্রোপোনিন-আই অ্যান্টিজেন, আল্ট্রাসনোগ্রাম ও সিরাম ক্রিয়েটিনিন। রোগীদের দাবি, সব পরীক্ষা একসঙ্গে করাতে বেসরকারি ডায়াগনস্টিক সেন্টারে কয়েক হাজার টাকা ব্যয় হচ্ছে।

প্রশ্ন উঠছে, দীর্ঘদিন ধরে যদি ডা. মোঃ রাকিবুল হাসানের বিরুদ্ধে এমন অভিযোগ থেকেই থাকে, তাহলে এতদিনে কেন কোনো কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি? অভিযোগের পর অভিযোগ উঠলেও তিনি কীভাবে একইভাবে রোগী দেখার সুযোগ পাচ্ছেন? তাঁর পেছনে কি কোনো প্রভাবশালী ‘খুঁটির জোর’ রয়েছে, যার কারণে বারবার অভিযোগ উঠলেও তিনি জবাবদিহির বাইরে থেকে যাচ্ছেন?

সবচেয়ে বড় ভোগান্তিতে পড়ছেন সাধারণ রোগীরা। সরকারি হাসপাতালে অল্প খরচে চিকিৎসার আশায় এসে যদি শেষ পর্যন্ত বাইরে গিয়ে কয়েক হাজার টাকা খরচ করে পরীক্ষা করাতে হয়, তাহলে স্বল্প আয়ের মানুষের জন্য সরকারি হাসপাতালের সেবার উদ্দেশ্যই বা কতটা পূরণ হচ্ছে? ১০ টাকার টিকিটে চিকিৎসা নিতে এসে যদি রোগীর হাতে ৫ থেকে ৮ হাজার টাকার পরীক্ষার তালিকা ধরিয়ে দেওয়া হয়, তাহলে সেই রোগী যাবে কোথায়?

এ বিষয়ে ডা. মোঃ রাকিবুল হাসানের বক্তব্য জানতে চাইলে তিনি বলেন, এ বিষয়ে সামনাসামনি কথা বলবেন; ফোনে কিছু বলবেন না।

খুলনা মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালের কার্ডিওলজি বিভাগের বিভাগীয় প্রধান এবং মেডিসিন ও হৃদরোগ বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ডা. মোস্তফা কামাল বলেন, ডা. রাকিব হাসান কোনো মেডিকেল অফিসার নন এবং হাসপাতালের কার্ডিওলজি বিভাগের সঙ্গেও তাঁর কোনো সম্পর্ক নেই। তাহলে তিনি কীভাবে নিয়মিত কার্ডিওলজি বিভাগের রোগী দেখছেন এটাই বড় প্রশ্ন। হাসপাতালের সঙ্গে দায়িত্বগত সম্পৃক্ততা না থাকলে তিনি কোন ক্ষমতাবলে রোগী দেখছেন, সেটিও খতিয়ে দেখা প্রয়োজন। তাঁর বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগগুলো অত্যন্ত গুরুতর। তাঁর কর্মকাণ্ডের কারণে সাধারণ মানুষ আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত ও নিঃস্ব হয়ে পড়ছে। এ ধরনের কর্মকাণ্ড কোনোভাবেই মেনে নেওয়া যায় না। অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্ত করে সত্যতা পাওয়া গেলে তাঁর বিরুদ্ধে কঠোর শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া উচিত।

তবে অভিযোগের বিষয়ে হাসপাতালের পরিচালক ডা. কাজী মোহাম্মদ আইনুল ইসলাম বলেন, বিষয়টি তাঁর জানা ছিল না। অভিযোগটি তদন্ত করে সত্যতা পাওয়া গেলে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

এখন প্রশ্ন উঠেছে- সরকারি হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে আসা রোগীদের প্রেসক্রিপশনে কেন ওষুধের বদলে একের পর এক ব্যয়বহুল পরীক্ষা দেওয়া হচ্ছে, এসব পরীক্ষা কোথায় করানোর পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে এবং এর পেছনে কোনো বাণিজ্যিক স্বার্থ রয়েছে কি না। অভিযোগের সত্যতা যাচাইয়ে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের কার্যকর তদন্ত এবং প্রেসক্রিপশন, রোগী-রেজিস্টার ও সংশ্লিষ্ট ডায়াগনস্টিক সেন্টারের সঙ্গে কোনো যোগসূত্র আছে কি না তা খতিয়ে দেখা জরুরি।