
যশোর প্রতিনিধিঃ মাহাদী হাসান মেহেদী
গতকাল ১৫ ডিসেম্বর ২০২৪ রবিবার বাংলাদেশ কৃষক সংগ্রাম সমিতি যশোর জেলা কমিটির পক্ষ থেকে ভবদহ অঞ্চলসহ দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের জলাবদ্ধতা সমস্যার স্থায়ী সমাধানে লক্ষে পূর্ব নির্ধারিত কর্মসূচির অংশ হিসেবে জেলা প্রশাসক বরাবর স্মারকলিপি প্রদান করা হয়। বেলা ১২ টায় সংগঠনের জেলা কার্যালয় থেকে মিছিল সহকারে জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের সামনে সংক্ষিপ্ত সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়। স্মারকলিপিটি জনাব মোঃ রফিকুল হাসান, উপ-পরিচালক স্থানীয় সরকার, যশোর মহোদয় গ্রহণ করেন। এ সময় জেলা কার্যালয়ের সামনে ও পাইপপট্টি মোড়ে পৃথক পথসভায় বক্তব্য রাখেন জেলা সাধারণ সম্পাদক হাফিজুর রহমান, সহ-সভাপতি আবুল কাশেম মুন্সী, সাংগঠনিক সম্পাদক সমীরণ বিশ্বাস, প্রচার সম্পাদক জগন্নাথ বিশ্বাস, জাতীয় গণতান্ত্রিক ফ্রন্ট যশোর জেলা সভাপতি আশুতোষ বিশ্বাস, প্রচার সম্পাদক কামরুজ্জামান রাজেস প্রমুখ। কর্মসূচিতে নেতৃবৃন্দ বলেন, জলাবদ্ধতা সমস্যার স্থায়ী সমাধানের লক্ষে অবাধ জোঁয়ার-ভাটার বিকল্প কোনো পথ নেই। এ প্রেক্ষিতে ভবদহ রেগুলেটরসহ নদীর ওপরে নির্মিত সকল অপরিকল্পিত অবকাঠামো উচ্ছেদ, ওয়াপদা বাঁধ উচ্ছেদ করে জলাবদ্ধ বিলগুলিতে অবাধ জোঁয়ার-ভাটা সৃষ্টি করতে হবে। নদীর জমি নদীকে ফিরিয়ে দিতে হবে এবং অবৈধ দখলদারদের উচ্ছেদ করতে হবে। নদ-নদী পরিকল্পিত উপায়ে খনন করতে হবে এবং খননকৃত পলি বিলের নিম্নাংশে ফেলতে হবে। পদ্মা নদীর উপর নির্মিত ফারাক্কা ব্যারেজ উৎচ্ছদেসহ আন্তর্জাতিক নদীসমূহের পানির ন্যায্য হিস্যা আদায়ে (আন্তর্জাতিক আইন অনুসারে) সরকারকে যথাযথ ভূমিকা নিতে হবে। পদ্মা নদীর সাথে মাথাভাঙ্গা, মাথাভাঙ্গা নদীর সাথে ভৈরবসহ দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের নদ-নদীর সংযোগ পুনঃস্থাপন ও নদীসমূহের আন্তঃসংযোগ চালু করতে হবে।
বার্তা প্রেরক
হাফিজুর রহমান
সাধারণ সম্পাদক
মোবাঃ ০১৭-১৪৮৪-৯২৬২
বরাবর
মাননীয় জেলা প্রশাসক
যশোর।
বিষয়ঃ ভবদহ জলাবদ্ধতা সমস্যার স্থায়ী সমাধানের দাবিতে স্মারকলিপি।
জনাব
বাংলাদেশ কৃষক সংগ্রাম সমিতি যশোর জেলা কমিটির পক্ষ থেকে সংগ্রামী শুভেচ্ছা রইল। আপনি নিশ্চয়ই অবগত আছেন যে, দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের ভূ-পৃষ্ঠের পানির স্তর নেমে যাওয়া, বন্যা, জলাবদ্ধতা, লবণাক্ততা, আর্সেনিক দূষণ তথা প্রাকৃতিক বির্পযয় ভয়াবহ রূপ ধারণ করেছে। যশোর, খুলনা ও সাতক্ষীরা জেলাসহ এ অঞ্চলের ১০টি থানার তিন শতাধিক গ্রাম জলাবদ্ধ সমস্যায় জর্জরিত। এখানকার ফসলের জমি, মৎস্য ঘের, বাড়ি-ঘর, রাস্তা-ঘাট পানির নীচে। নারিকেল, তাল, খেজুরসহ ফলজ ও বনজ বৃক্ষ উজাড় হয়ে যাচ্ছে। গবাদি পশুর সংখ্যাও কমে যাচ্ছে। জ্বালানী এবং খাওয়ার উপযোগী পানির সংকটও সুতীব্র। এমনকি মানুষ মারা গেলে দাফন বা শেষ কৃত্য করারও তিল পরিমাণ স্থান নেই। বেঁচে থাকার তাগিদে অনেকেই স্থানান্তরিত বা দেশান্তরিত (প্রায় ১৫ লক্ষ) হয়েছে যা এখনও অব্যাহত আছে। পানি বাহিত রোগে বিনা চিকিৎসায় মানুষ ধুকে ধুকে মরছে। কমিউনিটি ক্লিনিকে স্বাস্থ্যসেবা ব্যাহত হচ্ছে। এলাকার শতাধিক শিক্ষা প্রতিষ্ঠান পানিতে নিমজ্জিত হয়ে বন্ধ থাকায় শিক্ষার্থীরা ক্ষতিগ্রস্থ হচ্ছে। জলাবদ্ধতার শিকার এলাকায় ব্যাপকভাবে গরুর খাওয়ানোর বিছালী নষ্ট হয়ে যাওয়ার কারণে এর মূল্য বৃদ্ধির ফলে জলের দামে গরু বিক্রি করতে বাধ্য হয় জলাবদ্ধ এলাকার মানুষ। এলাকায় বিভিন্ন নদীর সাথে খালের সংযোগ কালভার্টের মুখ সম্পূর্ণ বেঁধে বন্ধ করে বড় বড় ঘের মালিকরা মাছ চাষ করছে। ১০ লক্ষ মানুষ এই সংকটের যাতাকলে পিষ্ট। সরকার জলাবদ্ধ এলাকায় মানুষের ক্ষুধা নিবারণ, দারিদ্রতা নিরসন ও জলাবদ্ধতা সমস্যার সমাধানে কোন কার্যকরী ভূমিকা পালন করছে না। যেটুকু করেছে তা লোক দেখানো মাত্র।
কৃষক ও কৃষি এ সংকট মূলত পুজিবাদী সাম্রাজ্যবাদী বিশ্বব্যবস্থা ও তার দোসরদের নির্মম শোষণের স্বার্থে পরিবেশ বিধ্বংসী উন্নয়ন কর্মকান্ডের কারণে এই প্রাকৃতিক বিপর্যয় সৃষ্টি হয়েছে। নদীর নাব্যতা রক্ষা ও ভূমি গঠন কার্যে প্রাকৃতিক নিয়ম অস্বীকার করছে। ব্রিটিশরা যেদিন থেকে ফসলের পরিবর্তে টাকায় খাজনা আদায় শুরু করেছিল সেদিন থেকে নদী ব্যবস্থাপনা বন্ধ হয়ে যায় যা অধ্যবধি অব্যাহত আছে। পদ্মা নদীর উপর হার্ডিঞ্জ ব্রিজসহ এ অঞ্চলের নদ-নদীসমূহের উপর অসংখ্য অপিরকল্পিত ব্রিজ-কার্লভার্ট নির্মাণ করে, নদীর মধ্যে কেরু কোম্পানি, সামরিক-বেসামরিক তথা সরকারি স্থাপনা ও ব্যক্তিগতভাবে অন্যান্য স্থাপনা নির্মাণ, শিক্ষা ও ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান ইত্যাদি অবকাঠামো নির্মাণ করে নদীর জমি দখল, নদীর সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দক্ষিণের নদীগুলিকে উত্তরের পানি প্রাপ্তির পথ বন্ধ করা ইত্যাদি কারণে দক্ষিণাঞ্চলের নদ-নদীগুলি নাব্যতা হারিয়েছে। এই সমস্যাকে সুতীব্র করেছে ভারত সরকার কর্তৃক আন্তর্জাতিক নদী আইন পরিপন্থীভাবে গঙ্গা নদীতে ফারাক্কা ব্যারেজসহ অভিন্ন নদ-নদী থেকে পানি প্রত্যাহার করে। ২য় মহাযুদ্ধের পর বিশ্বব্যাপি খাদ্য সংকট সমাধানে কৃষি উপকরণ বিপননের লক্ষ্যে সবুজ বিপ্লবের নামে ভূমি সৃষ্টির কথা বলে ৬০-এর দশকে ওয়াপদা বাঁধ নির্মাণ করে ভূমি গঠণের প্রাকৃতিক নিয়মে বাঁধা সৃষ্টি করা হয়। এর সাথে তাল মিলিয়ে ভবদহ স্লুইস গেট, পোল্ডার ব্যবস্থা, অপিরকল্পিত মৎস্য চাষ, নদীকে প্লাবনভূমি থেকে বঞ্চিত করায় নদী পলি পড়ে ভরাট হয়ে ৮০-এর দশকে জলাবদ্ধতা সমস্যা দেখা দেয়। বর্তমানে বিশ্বব্যাপি প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের ফলে সমুদ্র পৃষ্ঠের পানির উচ্চতা যেমন বৃদ্ধি পেয়েছে তেমনিভাবে বৃষ্টির পানি ও পলির পরিমাণ ও বহুগুণ বেড়ে এ সংকটকে আরও ঘনিভূত করে চলেছে।
ওয়াপদা বাঁধের কারণে নদীর ভাটির অংশ ভরাট হয়ে পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থায় বিপর্যয় সৃষ্টি করেছে। নদীর নাব্যতা ও ভূমি গঠন প্রক্রিয়া স্বাভাবিক করার জন্য প্রাকৃতিক নিয়ম কার্যকরী করা দরকার। কিন্তু কোন সরকার অধ্যবধি সমস্যার স্থায়ী সমাধানের উক্ত কার্যকর পদক্ষেপ বাস্তবায়ন করেনি। সমস্যা সমাধানের নামে অধ্যবধি যত প্রকল্প নেওয়া হয়েছে তা ব্যর্থতায় পর্যবসিত হয়েছে। এখনও পানি সেচে ও নদী খনন করে সমস্যার সমাধানের উদ্যোগ এবং টিআরএম (TRM) করার যে প্রক্রিয়া তাও সমস্যার কোন সমাধান করবে না।
(ইতিমধ্যে TRM প্রকল্প যে অপরিকল্পিত, নদী নাব্য ও ভূমি গঠনে ব্যর্থ তা প্রমাণিত। পূর্ব বিল খুকশিয়ার TRM -এর কারণে পশ্চিম বিল খুকশিয়া জলাবদ্ধ, কাটিং পয়েন্ট উঁচু। এ সকল ব্যর্থতার কারণে বিল কপালিয়ায় প্রকল্প করতে গেলে গণপ্রতিরোধের মুখে প্রকল্প বাস্তবায়ন করতে পারে না।) বরং ঋণের দায় ও জনগণের সংকট সুতীব্র করবে। আমরা ১৯৮৮ সালে বিল ডহুরি, ১৯৯০ সালে বিল ডাকাতিয়া, ১৯৯৭ সালে আগরহাটি-ভায়না বিলের ওয়াপদা বাঁধসহ বিল পাঁজিয়া, বিল বুড়ুলি, বিল পাথরাসহ অসংখ্য বিলের ওয়াপদা বাঁধ উচ্ছেদ করে অবাধ জোয়ার-ভাটা সৃষ্টির মাধ্যমে নদী নাব্য, বিলের ভূমি গঠন, পানির বিষাক্ততা সমস্যা সমাধানের পথ সামনে এনেছি। এই মুহুর্তে যশোরসহ এ অঞ্চলের জনজীবন প্রাকৃতিক বিপর্যয় থেকে রক্ষা করা অতীব জরুরি।
সকল অপরিকল্পিত অবকাঠামো উচ্ছেদ করে পরিকল্পিতভাবে নির্মাণ করতে হবে।
৫।( ক)ভবদহের দুইটি স্লুইচ গেটের মধ্যবর্তী মাটির বাঁধ উচ্ছেদ করে সেখানে পরিকল্পিত উপায়ে ব্রিজ নির্মাণ করতে হবে। মুক্তেশ্বরী, টেকা, হরি, হরিহর, ভদ্রা, শৈলমারী, গ্যাংরাইল, মংলা ও পশুর নদীর পানি প্রবাহের সকল প্রতিবন্ধকতা (রেগুলেটর, অপরিকল্পিত ব্রিজ ও নদীর জায়গা দখল) দূর করতে হবে।
ভবদাহ অঞ্চল, বিল ডাকাতিয়া সহ দক্ষিণাঞ্চলের জলাবদ্ধতা সমস্যার স্থায়ী সমাধানের লক্ষ্যে আমাদের দাবিসমূহ:
১। পদ্মা নদীর উপর নির্মিত ফারাক্কা ব্যারেজ উৎচ্ছদেসহ আন্তর্জাতিক নদীসমূহের পানির ন্যায্য হিস্যা আদায়ে (আন্তর্জাতিক আইন অনুসারে) সরকারকে যথাযথ ভূমিকা নিতে হবে। পদ্মা নদীর সাথে মাথাভাঙ্গা, মাথাভাঙ্গা নদীর সাথে ভৈরবসহ দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের নদ-নদীর সংযোগ পুনঃস্থাপন ও নদীসমূহের আন্তঃসংযোগ চালু করতে হবে।
২। পরিকল্পিতভাবে নদ-নদী ব্যবস্থাপনা গড়ে তুলতে হবে। ভৈরব, কপোতাক্ষ, বেতনা, চিত্রা, শৈলমারী, শ্রী, হরি, হরিহর, মুক্তেশ্বরী, ভদ্রাসহ দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের নদ-নদী পরিকল্পিতভাবে খনন করতে হবে। খননকৃত পলি বিলের নিচু অংশে ফেলতে হবে। নদীর উপর নির্মিত সকল অপরিকল্পিত অবকাঠামো উচ্ছেদ করে পরিকল্পিতভাবে নির্মাণ করতে হবে।
৩। ওয়াপদা বাঁধ উচ্ছেদ করে সকল নদ-নদীর সাথে শাখা-প্রশাখা, খাল-বিল-বাওড়ের সাথে বিলের সংযোগ পুনঃস্থাপন করে অবাধ জোয়ার-ভাটা চালু করতে হবে।
৪। নদ-নদী, শাখা-প্রশাখা ও খালের অংশ যা সরকারি ও ব্যক্তিগত পর্যায়ে বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে তা বাতিল এবং অবৈধ দখলদারদের উচ্ছেদ করে সিএস রেকর্ড অনুসারে নদীর জমি নদীকে ফিরিয়ে দিতে হবে।
৫।( ক)ভবদহের দুইটি স্লুইচ গেটের মধ্যবর্তী মাটির বাঁধ উচ্ছেদ করে সেখানে পরিকল্পিত উপায়ে ব্রিজ নির্মাণ করতে হবে। মুক্তেশ্বরী, টেকা, হরি, হরিহর, ভদ্রা, শৈলমারী, গ্যাংরাইল, মংলা ও পশুর নদীর পানি প্রবাহের সকল প্রতিবন্ধকতা (রেগুলেটর, অপরিকল্পিত ব্রিজ ও নদীর জায়গা দখল) দূর করতে হবে।
(খ) নদী সংলগ্ন জলাবদ্ধ বিলগুলিতে সর্ব প্রথম অবাধ জোয়ার-ভাটা সৃষ্টি করতে হবে।
গ) ভবদহের পার্শ্ববর্তী ক্রসড্যাম উচ্ছেদ করে ফুলতলা বা ডাকাতিয়া বিলের দিকে প্রবাহিত প্রশাখাটি মুক্ত ও খনন করে ভৈরব নদ ও বিল-ডাকাতিয়ার সাথে পুনঃসংযোগ ঘটাতে হবে।
ঘ) অবাধ জোয়ার-ভাটা সৃষ্টিকৃত বিলগুলির চাষীদের মাঝে লবনাক্ত ও বন্যা সহিষ্ণু ধান-পাটসহ ফসলের বীজ সরবরাহ এবং বিলে অপরিকল্পিত মাছ চাষ বন্ধ করে পরিকল্পিত উপায়ে মাছ চাষের ব্যবস্থা করতে হবে।
৬) অপরিকল্পিত মৎস্য চাষ বন্ধ করতে হবে।
৭) জলাবদ্ধ এলাকাকে দুর্গত এলাকা ঘোষণা করে পর্যাপ্ত রেশনিং ব্যবস্থা চালু করতে হবে। অত্র এলাকার এনজিও ঋণসহ সকল রূপের ঋণ মওকুফ করতে হবে।
৮) অবিলম্বে খাস জমি ভূমিহীন, গরিব কৃষকদের মাঝে বণ্টন করত হবে।











