০৮:৪৯ অপরাহ্ন, সোমবার, ০২ নভেম্বর ২০২৬, ১৮ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

অবুঝ শিশুকে বুকে নিয়ে স্বামীর ঘরের আশায় বিথীকা, মনিরামপুরে এক অসহায় মায়ের আকুতি

  • blank Reporter Name
  • Update Time : ০২:০৫:৫৮ অপরাহ্ন, শনিবার, ১২ সেপ্টেম্বর ২০২৬
  • ৩২ Time View
blank
blank

 

নির্যাতনের অভিযোগ, পরকীয়ার দাবি, তালাকের নোটিস সংসার বাঁচাতে দ্বারে দ্বারে অসহায় নারী

নিজস্ব প্রতিবেদক, মণিরামপুর (যশোর):

এক হাতে ছয় মাসের শিশু, অন্য হাতে সংসার বাঁচানোর শেষ চেষ্টা। শরীরে নির্যাতনের ক্ষত, চোখে কান্না আর মনে একটাই প্রশ্ন—স্বামীর ঘরে কি আর ফিরতে পারবেন বিথীকা?
যে ঘরটিকে ঘিরে একজন নারী স্বপ্ন দেখেছিলেন, সেই ঘর থেকেই এখন তালাকের নোটিশ। স্বামীর বিরুদ্ধে নির্যাতনের অভিযোগ, অর্থের দাবির অভিযোগ, পরকীয়ার অভিযোগ—সবকিছুর পরও সংসার ভাঙতে নারাজ বিথীকা সুলতানা (২৭)। কোলে ছয় মাসের সন্তানকে নিয়ে তিনি চান স্বামীর ঘরে ফিরে যেতে, চান সন্তানকে নিয়ে নিরাপদ ও সম্মানজনক জীবন।
কিন্তু তার সেই আকুতির বিপরীতে দাঁড়িয়ে আছে তালাকের নোটিশ।
যশোরের মণিরামপুর উপজেলার দূর্বাদাঙ্গা ইউনিয়নের বাহিরঘরিয়া গ্রামের কৃষক মহাতাপের মেয়ে বিথীকা সুলতানা। ২০২৩ সালের ১৭ এপ্রিল একই ইউনিয়নের কাজীয়াড়া গ্রামের মৃত খালেক গাজীর ছেলে মেহেদী হাসানের সঙ্গে পারিবারিকভাবে তার বিয়ে হয়।
‘সংসার টিকিয়ে রাখতে বাবার দেওয়া ৭০ হাজার টাকাও শেষ পর্যন্ত কাজে এল না’
বিথীকার পরিবারের দাবি, বিয়ের পর স্বামীর আর্থিক সংকট দেখা দিলে মেয়ের সংসার টিকিয়ে রাখতে তার বাবা জামাইকে চায়ের দোকান দেওয়ার জন্য ৭০ হাজার টাকা দেন। বিভিন্ন সময়ে চাল-ডালসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় সামগ্রী এবং পাঁচটি ছাগলও দেওয়া হয়,দুইটা সোনার আংটি ও দুই ভরি রুপার গহনা দেওয়া ছিলো সেগুলোও বিক্রিয় করে নিয়েছে তার স্বামী।
কিন্তু পরিবারের পক্ষ থেকে একের পর এক সহযোগিতা করার পরও সংসারে স্থায়ী শান্তি ফেরেনি বলে অভিযোগ বিথীকার।
তার দাবি, অর্থের জন্য তাকে বিভিন্ন সময়ে মানসিক ও শারীরিকভাবে নির্যাতন করা হয়েছে।
বিথীকার ভাষ্য, স্বামীর আর্থিক অনিশ্চয়তার কথা চিন্তা করে তিনি সন্তান নিতে আগ্রহী ছিলেন না। কিন্তু স্বামী ও শাশুড়ির চাপে শেষ পর্যন্ত গর্ভবতী হন। সন্তান প্রসবের সময় ঘনিয়ে এলে নির্যাতনের মাত্রা আরও বেড়ে যায় বলে অভিযোগ করেন তিনি।
একপর্যায়ে বাধ্য হয়ে বাবার বাড়িতে গিয়ে সন্তান প্রসব করেন বিথীকা।
সন্তান জন্মের পরও স্বামীর অনীহা?
বিথীকার দাবি, সন্তান জন্মের পর একই ইউনিয়নে বসবাস করলেও স্বামী মেহেদী হাসান মাত্র একদিন হাসপাতালে তাকে দেখতে যান। এরপর স্ত্রী ও সন্তানকে নিজের বাড়িতে নিয়ে যেতে অনীহা প্রকাশ করেন।
প্রায় ছয় মাস বাবার বাড়িতে থাকার পরও হাল ছাড়েননি বিথীকা। বুকের শিশুকে কোলে নিয়ে আবারও স্বামীর কাছে ফিরে যাওয়ার চেষ্টা করেন। শেষ পর্যন্ত স্বামীর চায়ের দোকানে গিয়ে ওঠেন তিনি।
স্থানীয়দের হস্তক্ষেপে মেহেদী তাকে বাড়িতে তুললেও সেখানেই আবার শুরু হয় নতুন সংকট—এমনটাই অভিযোগ বিথীকার।
ঘরে তালা, খাবার-ভরণপোষণ নিয়েও অভিযোগ
বিথীকার অভিযোগ, তার শাশুড়ি লালভানু বেগম ঘরে তালা দিয়ে দেন। পরে স্থানীয় মাতব্বরদের হস্তক্ষেপে তালা খোলা হলেও স্ত্রী ও শিশুর জন্য নিয়মিত খাবার কিংবা ভরণপোষণের ব্যবস্থা করা হয়নি বলে দাবি করেন তিনি।
এরপর স্বামীর বিরুদ্ধে আরও গুরুতর অভিযোগ তোলেন বিথীকা।
স্বামীর বিরুদ্ধে পরকীয়ার অভিযোগ, প্রতিবাদ করেও বিপাকে স্ত্রী
বিথীকার দাবি, তার স্বামী মেহেদী হাসান চায়ের দোকানের পাশের এক ব্যক্তির প্রবাসী ছেলে রিয়াজুলের স্ত্রী মুক্তা বেগমের সঙ্গে অনৈতিক সম্পর্কে জড়িয়ে পড়েন। স্বামীর মোবাইল ফোনের কথোপকথন নিয়ে আপত্তি জানালে পরিস্থিতি আরও উত্তপ্ত হয়ে ওঠে বলে অভিযোগ তার।
বিথীকার অভিযোগ, কথিত ওই সম্পর্কের প্রতিবাদ করায় তাকেই উল্টো লাঞ্ছনার শিকার হতে হয়েছে। এমনকি স্থানীয় ও পারিবারিকভাবে চাপ সৃষ্টি করে কথিত ওই নারীর কাছে গিয়ে ক্ষমা চাইতেও বাধ্য করা হয় বলে দাবি করেন তিনি।
স্বামী মেহেদী হাসান মাদকাসক্ত বলেও অভিযোগ করেছেন বিথীকা।
তবে পরকীয়াসহ এসব অভিযোগের স্বাধীন সত্যতা তাৎক্ষণিকভাবে নিশ্চিত করা সম্ভব হয়নি।
শিশুসহ ঘরে আটকে রড দিয়ে মারধরের অভিযোগ
বিথীকার অভিযোগের সবচেয়ে গুরুতর অংশটি ২০২৫ সালের ৯ মার্চের ঘটনা।
তার দাবি, স্বামীর কথিত পরকীয়ার প্রতিবাদ করায় তাকে ও তার ছয় মাস বয়সী শিশুকে ঘরের দরজা বন্ধ করে রড দিয়ে মারধর করা হয়। এ ঘটনায় স্বামী মেহেদী হাসান ও তার মা লালভানু বেগম জড়িত ছিলেন বলে অভিযোগ করেন তিনি।
আহত অবস্থায় মণিরামপুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে চিকিৎসা নিয়েছেন বলেও জানান বিথীকা। এ-সংক্রান্ত হাসপাতালের জরুরি বিভাগের পুলিশ কেস-সংক্রান্ত একটি নথির কপি তার কাছে রয়েছে বলে দাবি করা হয়েছে।
তবে ওই নথির পূর্ণাঙ্গ বিষয়বস্তু, এ ঘটনায় কোনো মামলা হয়েছে কি না এবং হয়ে থাকলে তার বর্তমান অবস্থা—এসব বিষয় সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে যাচাই করা প্রয়োজন।
নির্যাতনের অভিযোগের পরও সংসার ছাড়তে চাননি
চিকিৎসা নেওয়ার পরও স্বামীর সংসার থেকে নিজেকে সরিয়ে নেননি বিথীকা। স্থানীয় মাতব্বরদের কাছে গেছেন, থানায় যোগাযোগ করেছেন, স্বামীর ঘরে ফিরে যাওয়ার চেষ্টা করেছেন।
কিন্তু তার দাবি, সংসার বাঁচানোর সেই চেষ্টার মধ্যেই তার কাছে পাঠানো হয় তালাকের নোটিশ।
বিথীকার প্রশ্ন—যদি সংসারে সমস্যা থেকেও থাকে, তাহলে ছয় মাসের শিশুটির ভবিষ্যৎ কী? আর একজন স্ত্রীকে তার বক্তব্য না শুনেই কি এভাবে সংসার থেকে বিচ্ছিন্ন করে দেওয়া হবে?
বড় ভাইয়ের বিরুদ্ধেও অভিযোগ
বিথীকা তার সংসার ভাঙার পেছনে স্বামীর বড় ভাই সোহরাব হোসেনের ভূমিকা রয়েছে বলেও অভিযোগ করেছেন। তার দাবি, সোহরাব হোসেন মণিরামপুর পলিটেকনিক ইনস্টিটিউটের শিক্ষক এবং জামায়াতের রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত।
তবে সোহরাব হোসেন তার বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ অস্বীকার করেছেন।
বিথীকার স্বামী মেহেদী হাসানও তার বিরুদ্ধে ওঠা নির্যাতন, পরকীয়া ও অন্যান্য অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। উল্টো তার দাবি, তার মা হামলার শিকার হয়েছেন।
স্থানীয়দের ভাষ্য—‘সংসার বাঁচাতে মেয়েটি অনেক কিছু সহ্য করেছে’
স্থানীয় বাসিন্দা মোশারফ হোসেন ও জসিম বলেন, বিথীকা দীর্ঘদিন ধরে সংসার টিকিয়ে রাখার চেষ্টা করেছেন। তাদের ভাষ্য, সংসার বাঁচানোর আশায় তিনি অনেক কিছু সহ্য করেছেন।
বিথীকা সুলতানা বলেন, “থানা প্রথমে মামলা নেয়নি। এখন আমি লিগ্যাল এইডের মাধ্যমে আইনি লড়াইয়ের প্রস্তুতি নিচ্ছি। আমি আমার নিষ্পাপ সন্তানকে নিয়ে বড় বিপদে আছি। আমি কারও ক্ষতি চাই না। আমি আমার ও সন্তানের অধিকার, নিরাপত্তা এবং ন্যায়বিচার চাই।”
এখন প্রশ্ন—অভিযোগের সত্যতা যাচাই করবে কে?
একজন নারীর শরীরে নির্যাতনের চিহ্ন থাকার দাবি, স্বামীর বিরুদ্ধে একাধিক গুরুতর অভিযোগ, তালাকের নোটিশ এবং কোলে মাত্র ছয় মাসের শিশু—ঘটনাটি এখন আর শুধুই স্বামী-স্ত্রীর ব্যক্তিগত বিরোধ হিসেবে দেখার সুযোগ আছে কি না, সেটিই বড় প্রশ্ন।
বিথীকার অভিযোগ সত্য হলে, তার ও তার শিশুর নিরাপত্তা, ভরণপোষণ এবং আইনগত অধিকার নিশ্চিত করা জরুরি। আবার অভিযোগের কোনো অংশ অসত্য হলে সেটিও নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে স্পষ্ট হওয়া প্রয়োজন।
আইনের কাজ অভিযোগের পক্ষে বা বিপক্ষে দাঁড়ানো নয়—সত্য উদঘাটন করা।
তাই এখন প্রয়োজন নিরপেক্ষ তদন্ত। হাসপাতালের নথি, অভিযোগের কাগজপত্র, সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বক্তব্য এবং স্থানীয়দের সাক্ষ্য যাচাই করে প্রকৃত ঘটনা সামনে আনা।
কারণ, এই ঘটনায় শুধু একটি সংসারের ভবিষ্যৎ নয়—জড়িয়ে আছে ছয় মাসের এক শিশুর নিরাপত্তা ও ভবিষ্যৎ এবং একজন নারীর ন্যায়বিচার পাওয়ার অধিকার।
বিথীকা বলেন, “আমি প্রতিশোধ চাই না। আমি শুধু আমার সন্তানকে নিয়ে নিরাপদে বাঁচতে চাই। সংসার করতে চাই, অধিকার নিয়ে বাঁচতে চাই।”
এখন দেখার বিষয়, সেই আকুতি কি পৌঁছাবে ন্যায়বিচারের দরজায়—নাকি ছয় মাসের শিশুকে বুকে নিয়েই বিথীকার সংসার ফেরার শেষ আশাটুকুও হারিয়ে যাবে?

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

About Author Information
blank

blank

আহত পত্রিকা বিক্রেতা বুলবুলের পাশে তানোর প্রেসক্লাব

অবুঝ শিশুকে বুকে নিয়ে স্বামীর ঘরের আশায় বিথীকা, মনিরামপুরে এক অসহায় মায়ের আকুতি

Update Time : ০২:০৫:৫৮ অপরাহ্ন, শনিবার, ১২ সেপ্টেম্বর ২০২৬
blank
blank

 

নির্যাতনের অভিযোগ, পরকীয়ার দাবি, তালাকের নোটিস সংসার বাঁচাতে দ্বারে দ্বারে অসহায় নারী

নিজস্ব প্রতিবেদক, মণিরামপুর (যশোর):

এক হাতে ছয় মাসের শিশু, অন্য হাতে সংসার বাঁচানোর শেষ চেষ্টা। শরীরে নির্যাতনের ক্ষত, চোখে কান্না আর মনে একটাই প্রশ্ন—স্বামীর ঘরে কি আর ফিরতে পারবেন বিথীকা?
যে ঘরটিকে ঘিরে একজন নারী স্বপ্ন দেখেছিলেন, সেই ঘর থেকেই এখন তালাকের নোটিশ। স্বামীর বিরুদ্ধে নির্যাতনের অভিযোগ, অর্থের দাবির অভিযোগ, পরকীয়ার অভিযোগ—সবকিছুর পরও সংসার ভাঙতে নারাজ বিথীকা সুলতানা (২৭)। কোলে ছয় মাসের সন্তানকে নিয়ে তিনি চান স্বামীর ঘরে ফিরে যেতে, চান সন্তানকে নিয়ে নিরাপদ ও সম্মানজনক জীবন।
কিন্তু তার সেই আকুতির বিপরীতে দাঁড়িয়ে আছে তালাকের নোটিশ।
যশোরের মণিরামপুর উপজেলার দূর্বাদাঙ্গা ইউনিয়নের বাহিরঘরিয়া গ্রামের কৃষক মহাতাপের মেয়ে বিথীকা সুলতানা। ২০২৩ সালের ১৭ এপ্রিল একই ইউনিয়নের কাজীয়াড়া গ্রামের মৃত খালেক গাজীর ছেলে মেহেদী হাসানের সঙ্গে পারিবারিকভাবে তার বিয়ে হয়।
‘সংসার টিকিয়ে রাখতে বাবার দেওয়া ৭০ হাজার টাকাও শেষ পর্যন্ত কাজে এল না’
বিথীকার পরিবারের দাবি, বিয়ের পর স্বামীর আর্থিক সংকট দেখা দিলে মেয়ের সংসার টিকিয়ে রাখতে তার বাবা জামাইকে চায়ের দোকান দেওয়ার জন্য ৭০ হাজার টাকা দেন। বিভিন্ন সময়ে চাল-ডালসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় সামগ্রী এবং পাঁচটি ছাগলও দেওয়া হয়,দুইটা সোনার আংটি ও দুই ভরি রুপার গহনা দেওয়া ছিলো সেগুলোও বিক্রিয় করে নিয়েছে তার স্বামী।
কিন্তু পরিবারের পক্ষ থেকে একের পর এক সহযোগিতা করার পরও সংসারে স্থায়ী শান্তি ফেরেনি বলে অভিযোগ বিথীকার।
তার দাবি, অর্থের জন্য তাকে বিভিন্ন সময়ে মানসিক ও শারীরিকভাবে নির্যাতন করা হয়েছে।
বিথীকার ভাষ্য, স্বামীর আর্থিক অনিশ্চয়তার কথা চিন্তা করে তিনি সন্তান নিতে আগ্রহী ছিলেন না। কিন্তু স্বামী ও শাশুড়ির চাপে শেষ পর্যন্ত গর্ভবতী হন। সন্তান প্রসবের সময় ঘনিয়ে এলে নির্যাতনের মাত্রা আরও বেড়ে যায় বলে অভিযোগ করেন তিনি।
একপর্যায়ে বাধ্য হয়ে বাবার বাড়িতে গিয়ে সন্তান প্রসব করেন বিথীকা।
সন্তান জন্মের পরও স্বামীর অনীহা?
বিথীকার দাবি, সন্তান জন্মের পর একই ইউনিয়নে বসবাস করলেও স্বামী মেহেদী হাসান মাত্র একদিন হাসপাতালে তাকে দেখতে যান। এরপর স্ত্রী ও সন্তানকে নিজের বাড়িতে নিয়ে যেতে অনীহা প্রকাশ করেন।
প্রায় ছয় মাস বাবার বাড়িতে থাকার পরও হাল ছাড়েননি বিথীকা। বুকের শিশুকে কোলে নিয়ে আবারও স্বামীর কাছে ফিরে যাওয়ার চেষ্টা করেন। শেষ পর্যন্ত স্বামীর চায়ের দোকানে গিয়ে ওঠেন তিনি।
স্থানীয়দের হস্তক্ষেপে মেহেদী তাকে বাড়িতে তুললেও সেখানেই আবার শুরু হয় নতুন সংকট—এমনটাই অভিযোগ বিথীকার।
ঘরে তালা, খাবার-ভরণপোষণ নিয়েও অভিযোগ
বিথীকার অভিযোগ, তার শাশুড়ি লালভানু বেগম ঘরে তালা দিয়ে দেন। পরে স্থানীয় মাতব্বরদের হস্তক্ষেপে তালা খোলা হলেও স্ত্রী ও শিশুর জন্য নিয়মিত খাবার কিংবা ভরণপোষণের ব্যবস্থা করা হয়নি বলে দাবি করেন তিনি।
এরপর স্বামীর বিরুদ্ধে আরও গুরুতর অভিযোগ তোলেন বিথীকা।
স্বামীর বিরুদ্ধে পরকীয়ার অভিযোগ, প্রতিবাদ করেও বিপাকে স্ত্রী
বিথীকার দাবি, তার স্বামী মেহেদী হাসান চায়ের দোকানের পাশের এক ব্যক্তির প্রবাসী ছেলে রিয়াজুলের স্ত্রী মুক্তা বেগমের সঙ্গে অনৈতিক সম্পর্কে জড়িয়ে পড়েন। স্বামীর মোবাইল ফোনের কথোপকথন নিয়ে আপত্তি জানালে পরিস্থিতি আরও উত্তপ্ত হয়ে ওঠে বলে অভিযোগ তার।
বিথীকার অভিযোগ, কথিত ওই সম্পর্কের প্রতিবাদ করায় তাকেই উল্টো লাঞ্ছনার শিকার হতে হয়েছে। এমনকি স্থানীয় ও পারিবারিকভাবে চাপ সৃষ্টি করে কথিত ওই নারীর কাছে গিয়ে ক্ষমা চাইতেও বাধ্য করা হয় বলে দাবি করেন তিনি।
স্বামী মেহেদী হাসান মাদকাসক্ত বলেও অভিযোগ করেছেন বিথীকা।
তবে পরকীয়াসহ এসব অভিযোগের স্বাধীন সত্যতা তাৎক্ষণিকভাবে নিশ্চিত করা সম্ভব হয়নি।
শিশুসহ ঘরে আটকে রড দিয়ে মারধরের অভিযোগ
বিথীকার অভিযোগের সবচেয়ে গুরুতর অংশটি ২০২৫ সালের ৯ মার্চের ঘটনা।
তার দাবি, স্বামীর কথিত পরকীয়ার প্রতিবাদ করায় তাকে ও তার ছয় মাস বয়সী শিশুকে ঘরের দরজা বন্ধ করে রড দিয়ে মারধর করা হয়। এ ঘটনায় স্বামী মেহেদী হাসান ও তার মা লালভানু বেগম জড়িত ছিলেন বলে অভিযোগ করেন তিনি।
আহত অবস্থায় মণিরামপুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে চিকিৎসা নিয়েছেন বলেও জানান বিথীকা। এ-সংক্রান্ত হাসপাতালের জরুরি বিভাগের পুলিশ কেস-সংক্রান্ত একটি নথির কপি তার কাছে রয়েছে বলে দাবি করা হয়েছে।
তবে ওই নথির পূর্ণাঙ্গ বিষয়বস্তু, এ ঘটনায় কোনো মামলা হয়েছে কি না এবং হয়ে থাকলে তার বর্তমান অবস্থা—এসব বিষয় সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে যাচাই করা প্রয়োজন।
নির্যাতনের অভিযোগের পরও সংসার ছাড়তে চাননি
চিকিৎসা নেওয়ার পরও স্বামীর সংসার থেকে নিজেকে সরিয়ে নেননি বিথীকা। স্থানীয় মাতব্বরদের কাছে গেছেন, থানায় যোগাযোগ করেছেন, স্বামীর ঘরে ফিরে যাওয়ার চেষ্টা করেছেন।
কিন্তু তার দাবি, সংসার বাঁচানোর সেই চেষ্টার মধ্যেই তার কাছে পাঠানো হয় তালাকের নোটিশ।
বিথীকার প্রশ্ন—যদি সংসারে সমস্যা থেকেও থাকে, তাহলে ছয় মাসের শিশুটির ভবিষ্যৎ কী? আর একজন স্ত্রীকে তার বক্তব্য না শুনেই কি এভাবে সংসার থেকে বিচ্ছিন্ন করে দেওয়া হবে?
বড় ভাইয়ের বিরুদ্ধেও অভিযোগ
বিথীকা তার সংসার ভাঙার পেছনে স্বামীর বড় ভাই সোহরাব হোসেনের ভূমিকা রয়েছে বলেও অভিযোগ করেছেন। তার দাবি, সোহরাব হোসেন মণিরামপুর পলিটেকনিক ইনস্টিটিউটের শিক্ষক এবং জামায়াতের রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত।
তবে সোহরাব হোসেন তার বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ অস্বীকার করেছেন।
বিথীকার স্বামী মেহেদী হাসানও তার বিরুদ্ধে ওঠা নির্যাতন, পরকীয়া ও অন্যান্য অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। উল্টো তার দাবি, তার মা হামলার শিকার হয়েছেন।
স্থানীয়দের ভাষ্য—‘সংসার বাঁচাতে মেয়েটি অনেক কিছু সহ্য করেছে’
স্থানীয় বাসিন্দা মোশারফ হোসেন ও জসিম বলেন, বিথীকা দীর্ঘদিন ধরে সংসার টিকিয়ে রাখার চেষ্টা করেছেন। তাদের ভাষ্য, সংসার বাঁচানোর আশায় তিনি অনেক কিছু সহ্য করেছেন।
বিথীকা সুলতানা বলেন, “থানা প্রথমে মামলা নেয়নি। এখন আমি লিগ্যাল এইডের মাধ্যমে আইনি লড়াইয়ের প্রস্তুতি নিচ্ছি। আমি আমার নিষ্পাপ সন্তানকে নিয়ে বড় বিপদে আছি। আমি কারও ক্ষতি চাই না। আমি আমার ও সন্তানের অধিকার, নিরাপত্তা এবং ন্যায়বিচার চাই।”
এখন প্রশ্ন—অভিযোগের সত্যতা যাচাই করবে কে?
একজন নারীর শরীরে নির্যাতনের চিহ্ন থাকার দাবি, স্বামীর বিরুদ্ধে একাধিক গুরুতর অভিযোগ, তালাকের নোটিশ এবং কোলে মাত্র ছয় মাসের শিশু—ঘটনাটি এখন আর শুধুই স্বামী-স্ত্রীর ব্যক্তিগত বিরোধ হিসেবে দেখার সুযোগ আছে কি না, সেটিই বড় প্রশ্ন।
বিথীকার অভিযোগ সত্য হলে, তার ও তার শিশুর নিরাপত্তা, ভরণপোষণ এবং আইনগত অধিকার নিশ্চিত করা জরুরি। আবার অভিযোগের কোনো অংশ অসত্য হলে সেটিও নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে স্পষ্ট হওয়া প্রয়োজন।
আইনের কাজ অভিযোগের পক্ষে বা বিপক্ষে দাঁড়ানো নয়—সত্য উদঘাটন করা।
তাই এখন প্রয়োজন নিরপেক্ষ তদন্ত। হাসপাতালের নথি, অভিযোগের কাগজপত্র, সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বক্তব্য এবং স্থানীয়দের সাক্ষ্য যাচাই করে প্রকৃত ঘটনা সামনে আনা।
কারণ, এই ঘটনায় শুধু একটি সংসারের ভবিষ্যৎ নয়—জড়িয়ে আছে ছয় মাসের এক শিশুর নিরাপত্তা ও ভবিষ্যৎ এবং একজন নারীর ন্যায়বিচার পাওয়ার অধিকার।
বিথীকা বলেন, “আমি প্রতিশোধ চাই না। আমি শুধু আমার সন্তানকে নিয়ে নিরাপদে বাঁচতে চাই। সংসার করতে চাই, অধিকার নিয়ে বাঁচতে চাই।”
এখন দেখার বিষয়, সেই আকুতি কি পৌঁছাবে ন্যায়বিচারের দরজায়—নাকি ছয় মাসের শিশুকে বুকে নিয়েই বিথীকার সংসার ফেরার শেষ আশাটুকুও হারিয়ে যাবে?