দেবহাটা,সাতক্ষীরা প্রতিনিধিঃ
সাতক্ষীরার দেবহাটা উপজেলার কুলিয়া ইউনিয়নের বাসিন্দা মোস্তাফিজুর রহমান মুস্তাফিজ নিজের নামের পাশে ‘সাংবাদিক’ পরিচয় ব্যবহার করলেও বাস্তবে তার বিরুদ্ধে রয়েছে একাধিক চাঞ্চল্যকর অভিযোগ যার মধ্যে রয়েছে ধর্ষণের শিকার শিশু ও নারীদের ফেসবুক লাইভে এনে তাদের চেহারা ও লজ্জাস্থান দেখানো, ফেসবুক লাইভে মিথ্যা প্রচার, মাদকসেবন, চাঁদাবাজি এবং প্রাণনাশের হুমকি।
সর্বশেষ, মুস্তাফিজের বিরুদ্ধে প্রাণনাশের হুমকি দিয়ে ফেসবুক লাইভে মানহানিকর বক্তব্য প্রচারের অভিযোগে দেবহাটা থানায় লিখিত অভিযোগ দিয়েছেন পারুলিয়ার স্থানীয় সাংবাদিক আব্দুল্লাহ আল মামুন। সাংবাদিক মামুন বলেন, “মুস্তাফিজ দীর্ঘদিন ধরে সাংবাদিকতার নামে মানুষের জীবন নষ্ট করছে। লাইভে মিথ্যা তথ্য ছড়িয়ে মানুষকে হেয় করে, ভয় দেখিয়ে চাঁদা আদায় করে। আমি তার এসব কর্মকাণ্ড নিয়ে কথা বলায় সে আমাকে নিয়ে ফেসবুক লাইভে সরাসরি প্রাণনাশের হুমকি দেয়। আমি দেবহাটা থানায় লিখিত অভিযোগ করেছি।”
এ বিষয়ে দেবহাটা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) গোলাম কিবরিয়া বলেন, “শুনেছি মুস্তাফিজ নামে একজন বিভিন্ন জায়গায় লাইভ করে। অনেক স্পর্শকাতর বিষয়, যেগুলো লাইভ করা যায় না সেই বিষয়গুলো সে ফেসবুকে প্রচার করে। ধর্ষণের শিকার নারীদের পর্যন্ত তার লাইভে আনার অভিযোগও শুনেছি। তবে এখন পর্যন্ত কেউ লিখিত অভিযোগ করেনি। কেউ যদি জিডি করে বা সাইবার ক্রাইম ট্রাইব্যুনালে মামলা করে, তাহলে আমরা অবশ্যই আইনগত ব্যবস্থা নেব।”
ধর্ষিত নারী ও শিশুদের বিকৃতভাবে লাইভে উপস্থাপন
ভিউ ও লাইক বাড়ানোর আশায় মুস্তাফিজ ধর্ষণের শিকার নারী ও শিশুদের লাইভে এনে তাদের চেহারা ও লজ্জাস্থান দেখানোর মতো চরম বিকৃত ও অমানবিক কাজ করছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। এইসব ভিডিওতে অনেক সময় ভিকটিমদের মুখ দেখা যায়, এমনকি তারা আতঙ্কিত ও বিভ্রান্ত অবস্থায় থাকেন। এমন কর্মকাণ্ড শুধু সামাজিকভাবে নয়, আইনগতভাবেও গুরুতর অপরাধ।
আইন কী বলে?
ধর্ষণের শিকার নারী বা শিশুর নাম, ছবি বা পরিচয় প্রকাশ সম্পূর্ণ বেআইনি।
নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন, ২০০০ (ধারা ১৪): ধর্ষণের শিকার ব্যক্তির পরিচয় প্রকাশে সর্বোচ্চ ২ বছর কারাদণ্ড বা অর্থদণ্ড।
শিশু আইন, ২০১৩ (ধারা ৮১): শিশুর সম্মানহানি হয় এমনভাবে পরিচয় প্রকাশ নিষিদ্ধ।
ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন, ২০১৮ (ধারা ২৪, ২৯, ৩১): নারী বা শিশুর মর্যাদা ক্ষুণ্ণ হয় এমন কনটেন্ট প্রচারে ৩–৫ বছর জেল বা জরিমানা।
দণ্ডবিধি ১৮৬০ (ধারা ৫০৯): নারীর শালীনতা ভঙ্গের অপরাধে ১ বছর জেল বা অর্থদণ্ড। মুস্তাফিজের এসব কার্যকলাপ এসব আইনের স্পষ্ট লঙ্ঘন।
অতীতে মাদক ও লুটপাটের মামলায় গ্রেপ্তার হয় মুস্তাফিজ
২০২০ সালের ২ সেপ্টেম্বর মুস্তাফিজ ও তার তৎকালীন স্ত্রী জেলা মহিলা আওয়ামী লীগ নেত্রী মিলি সাতক্ষীরা সদর থানায় চাঁদাবাজি ও মাদক সংক্রান্ত মামলায় গ্রেপ্তার হন।
অভিযোগ ছিল, তালাকপ্রাপ্ত নারী মাসুরা খাতুনকে সঙ্গে নিয়ে তারা তার সাবেক স্বামী আলমগীর হোসেনের বাড়িতে ঢুকে নগদ টাকা, জমির দলিল, স্বর্ণালঙ্কারসহ মূল্যবান কাগজপত্র লুট করে। এ ঘটনায় আলমগীর হোসেন বাদী হয়ে মুস্তাফিজ, মিলিসহ ৫ জনকে আসামি করে মামলা করেন। পরে মুস্তাফিজের ইয়াবা সেবনের একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ভাইরাল হয়, যেখানে তাকে হাতে করে ইয়াবা নিয়ে সেবন করতে দেখা যায়।
প্রশাসনের হস্তক্ষেপ চান স্থানীয়রা
স্থানীয় সমাজসেবী ও সাংবাদিকরা বলছেন, মুস্তাফিজের মতো ব্যক্তিরা সাংবাদিকতার মুখোশ পরে চরম অপরাধে লিপ্ত থেকে সমাজে ভয়ানক প্রভাব ফেলছে।
একজন প্রবীণ শিক্ষক বলেন, “এই ব্যক্তি শিশুদের সামনে এনে এমন সব কথা বলে যা কেউ কল্পনাও করতে পারে না। এভাবে একটি সমাজ ভেঙে পড়ে। প্রশাসনের এখনই ব্যবস্থা নেয়া উচিত।”
দাবি: দ্রুত তদন্ত ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি
দেবহাটার সচেতন নাগরিক, সাংবাদিক ও অভিভাবকরা একবাক্যে বলেছেন মুস্তাফিজের কার্যকলাপ শুধু আইনের লঙ্ঘন নয়, সামাজিক মূল্যবোধ, শিশু সুরক্ষা ও নারীর মর্যাদাকে ভেঙে চুরমার করছে। তারা জেলা প্রশাসন, জেলা পুলিশ, ও সাইবার অপরাধ দমন ইউনিটের কাছে দ্রুত তদন্ত এবং আইনি পদক্ষেপের জোর দাবি জানিয়েছেন।