সাজ্জাত বিশ্বাস, স্টাপ রিপোর্টারঃ
আজ ২৪ ডিসেম্বর, ২০২১ সালের এই দিনে ঘটেছিল দেশের নৌ দুর্ঘটনার অন্যতম ঘটনাটি। সেদিন ভোররাতে ঝালকাঠির সুগন্ধা নদীতে এমভি অভিযান-১০ নামক লঞ্চটিতে আগুনে পুড়ে নির্মমভাবে নিহত হয়েছিলেন সাতচল্লিশ জন মানুষ। সেই ভয়াল স্মৃতি মনে করে এখনো আঁতকে ওঠেন সুগন্ধা নদীপাড়ের বাসিন্দা প্রত্যক্ষদর্শীরা। তারা জানান, নদীতে দাউ দাউ করে জ্বলছিল লঞ্চটি। আগুনের তিব্রতা এতটাই বেশি ছিল যে, কোথাও লঞ্চটি ভেড়ানো যায়নি। লঞ্চটিতে অগ্নি প্রতিরোধের কোন ব্যবস্থা ছিল না, ভোররাত হওয়ায় আগুন নেভাতেও নেওয়া হয়নি কোনো উদ্যোগ। স্থানীয় অনেক মানুষ এগিয়ে গেলেও লঞ্চ পর্যন্ত যেতে পারছিলেন না। কেউ কেউ ঝুঁকি নিয়ে অনেক যাত্রীকে উদ্ধারও করেছিলেন। সুগন্ধা নদীর ঘটনায় লঞ্চের আগুন নেভাতে ও উদ্ধারকাজের জন্য বরিশালের নৌ ফায়ার স্টেশন ইউনিট ও ডুবুরি দল এসেছিল। ট্রলারযোগে যেতে তাদের অনেক সময় পেরিয়ে যায়। সে সময় ঝালকাঠিতে একটি নৌ ফায়ার স্টেশন থাকলে দ্রুত পরিস্থিতির নিয়ন্ত্রণ করা যেত। এছাড়াও ২০২২ ও ২০২৩ সালে সুগন্ধা নদীতে তেলবাহী জাহাজ ওটি মৃদুলা ও এমভি সাগর নন্দিনীতে অগ্নিকান্ডের ঘটনা ঘটে। এতেও ১১জনের প্রাণহানীসহ ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়। সে সময় যদি ঝালকাঠিতে নৌ ফায়ার স্টেশন থাকত, তাহলে এত মানুষের প্রাণহানি ঘটত না বলে অভিমত স্থানীয়দের। একাধিক দুর্ঘটনায় অর্ধশতাধিক প্রাণহানির পর সেখানে একটি নৌ পুলিশ ও নৌ ফায়ার স্টেশন নির্মাণের দাবি উঠছিল, কিন্তু ঘটনার তিন বছর পেরিয়ে গেলেও তা বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। সুগন্ধা, বিষখালী, ধানসিঁড়ি, বাসন্ডা ও গাবখান এই পাঁচ নদীর মোহনায় উপকূলীয় জেলা ঝালকাঠির অবস্থান। দক্ষিণাঞ্চলে নৌ যোগাযোগে এ জেলার যথেষ্ট গুরুত্ব রয়েছে। নৌপথটিতে বিভিন্ন রুটে যাত্রীবাহী লঞ্চ ও পণ্যবাহী অসংখ্য জাহাজ চলাচল করে। এখানকার গাবখান চ্যানেল দিয়ে খুলনা, মোংলা, রূপপুর বিদ্যুৎকেন্দ্র ও কলকাতায় চলাচল করে অনেক নৌযান। এ ছাড়া বরগুনা, পাথরঘাটা, বরিশাল ও ঢাকার নৌযান চলাচল করে। ফলে সেখানে জেলাটিতে নৌ পুলিশ ও নৌ ফায়ার স্টেশনের প্রয়োজনীয়তা অনস্বীকার্য। নৌ ফায়ার স্টেশন থাকলে সেদিন ক্ষয়ক্ষতি ও প্রাণহানি আরও কম হতো বলে ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স কর্তৃপক্ষ স্বীকার করেছে। এরপরও কেন সেখানে একটি নৌ ফায়ার স্টেশন হবে না, সেটাই এলাকাবাসীর প্রশ্ন। প্রায় ৬০ বছর আগে ঝালকাঠিতে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল দ্বিতীয় শ্রেণির ফায়ার স্টেশন। সেটিকে ছয় বছর আগে প্রথম শ্রেণিতে উন্নীত করার প্রস্তাব পাঠানো হয়েছিল। তা-ও এখনো বাস্তবায়িত হয়নি। স্বাভাবিকভাবেই এ নিয়ে সেদিনের দুর্ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী ও স্থানীয় লোকজন ক্ষুব্ধ রয়েছেন। ফায়ার সার্ভিসের সূত্র জানায়, অভিযান-১০ লঞ্চটিতে অগ্নি প্রতিরোধের ব্যবস্থা তো ছিলই না, নির্বাপণেও নেওয়া হয়নি কোনো উদ্যোগ। ঝালকাঠি ফায়ার স্টেশনের সাব অফিসার সালাউদ্দিন মিয়া বলেন, অগ্নি দুর্ঘটনার বিষয়টি বিবেচনা করে ভবিষ্যতে প্রতিটি নৌযানে দুজন করে ফায়ার সার্ভিস কর্মী নিয়োগ দেওয়া প্রয়োজন। কারণ, এ ধরনের অগ্নিকান্ডের সময় লঞ্চের কর্মী ও যাত্রীরা ভয় পেয়ে যান। তাই ঘটনাস্থলে ফায়ার সার্ভিসের কর্মীরা থাকলে তাঁদের প্রশিক্ষণের অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগিয়ে আগুন নিয়ন্ত্রণে ব্যবস্থা নিতে পারবেন। সুগন্ধা নদীর তীরবর্তী দিয়াকুল গ্রামের বাসিন্দা আফজাল হোসেন বলেন, ‘সেদিন লঞ্চে অগ্নিকান্ডের পরে আমি শিশু-বয়স্ক ব্যক্তিসহ কয়েকজনকে নদী থেকে উদ্ধার করি। এখানে যদি নৌ ফায়ার স্টেশন থাকত, তাহলে এই পরিমাণ ক্ষতি হতো না। ওই ঘটনার পর থেকে শিক্ষা নিয়ে যদি ফায়ার স্টেশন স্থাপন করা না হয়, তাহলে পরবর্তী সময়েও এ রকম বিপদ আবারও ঘটতে পারে। ভয়াবহ সেই দুর্ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী সুগন্ধা নদীতীরের বাসিন্দা ঝালকাঠি পৌরসভার ৯ নম্বর ওয়ার্ডের সাবেক কাউন্সিলর হুমায়ূন কবির সাগর বলেন, ‘আগুন দেখেই দ্রুত উদ্ধারকাজে যোগ দিই সেদিন। অগ্নিদগ্ধ মানুষকে হাসপাতালে পৌঁছে দিয়েছি। সে রকম কোনো পরিস্থিতি যেন আর তৈরি না হয়, সে কারণে জরুরি ভিত্তিতে নৌ ফায়ার স্টেশন নির্মাণ করা দরকার। ঝালকাঠি ফায়ার সার্ভিসের স্টেশন অফিসার শফিকুল ইসলাম বলেন, ‘আমরা লঞ্চে ভয়াবহ অগ্নিকান্ডের পর ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে নৌ ফায়ার স্টেশনের জন্য আবেদন করেছি। কিন্তু তিন বছর পার হলেও তা বাস্তবায়ন হয়নি। নৌ ফায়ার স্টেশন হলে, এতে ডুবুরি দলও থাকবে, অগ্নিকান্ড হলে দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছানো যাবে।